গল্প
সোল টেকার
গল্পের পটভূমি
এই গল্পের কোনো পটভুমি নাই। তবে এখানে গল্পের প্রোটাগনিস্টের শৈশব/আর্লি লাইফ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
“আপনি পুরুষ নাকি মহিলা, সেটা কোনো ব্যাপার না,টাকাটাই আসল কথা।”
“বাশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ,
মাগো আমার যত্নে গড়া সোল টেকারটা কই ?”
নিজের হাতে তৈরি করা নতুন অস্ত্রটার একটা পারফেক্ট নাম খুজে বেড়াচ্ছে শিহাব। গত ১ মাস ধরে সে তৈরি করেছে এই পারফেক্ট কিলিং মেশিন। অনেক গুলো নামের মাঝে "সোল টেকার" নামটাই তার মনে খুব ধরল।
আসলেই সোল টেকার, এই অস্ত্র কারোর উপর প্রয়োগ করলে তার সোল আর তার ভিতরে থাকবে না। তবে এখনো এর প্রকৃত শক্তি পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। আজীবন পারফেকশনের পিছনে ছুটে বেড়ানো শিহাব কিছুতেই চাইছিলো না তার অসাধারণ অস্ত্রটা কোনো হেজিপেজি মানুষের উপর প্রয়োগ করতে। অস্ত্র পরীক্ষার জন্য সে বেছে নিয়েছিলো গ্রামের খমতাশীল কমিশনার মহিম শিকদারের উচ্ছন্নে যাওয়া ভাগিনা শরিফুলকে। শরিফুল এখন আর মানুষের পর্যায়ে নেই। মামা আর বাবার তীব্র ক্ষমতার কারণে সে নিজেকে সব কিছুর উর্ধ্বে মনে করে।
কাচা তরকারি বিক্রেতা আশরাফ কাকার মত মানুষ এই গ্রামে খুব কম আছে। বিপদে পড়ে ওনার কাছে গেলে উনি কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এমন কেউ বলতে পারবে না। সবাইকে উনি সাধ্য মত সাহায্য করার চেস্টা করেন। মজার বিষয় হচ্ছে উনি কাউকে সাহায্য করলে একটা শর্ত দিয়ে নিতেন। তা হলো, কাউকে এই সাহায্যের ব্যাপারে না জানাতে উনি অনুরোধ করতেন। তবুও একান ওকান হয়ে দু একটা খবর ঠিকই গ্রামে ছড়াত। আসাদ কাকার মেয়ের বিয়ে,এক্সিডেন্টে পা হারানো আলীকে মটর ভ্যান কিনে দেওয়া,লাদেন চাচার পিত্তপাথরের চিকিৎসা করানো...
আশরাফ চাচার মেয়ে মিলি, মেধাবী ছাত্রী। গতবছর মিলির উপর নজর পড়ল শরিফুলের। তার প্রেমের প্রস্তাব না মেনে নেওয়ায় স্কুলের সামনেই মিলিকে আক্রমণ করে সে। মিলিকে ঘুসি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়, মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে থাকে। এরপর বুকে আর পেটে একের পর এক লাথি মারতেই থাকে। মেয়েটার অসহায় চিতকার সবাই শুনতে পেলেও, কিছু বলার সাহস কারোর ছিলো না। এই শরিফুলই গতমাসে ভরা বাজারের মাঝে পাশের গ্রামের ফুটবল ক্লাবের সভাপতি জামশেদ কে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে মেরেছে। পুলিশ এসেছিলো ঘটনাস্থলে,কেউ কোনো স্বাক্ষী ছিলোনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাক্ষী দিতে কারোর ঠেকা পড়েনি।
মিলির দেহের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলেও শরিফুলের লাথি বন্ধ হয়নি। মিলির মুখ থেকে এখন কেবল কালো রক্ত বের হচ্ছে। চায়ের দোকানে ৫/৬ জন মানুষের মধ্যে ইকবাল স্যার ও ছিলো, মিলিকে তিনি মা বলে ডাকতেন। দারুন মেধাবী ছাত্রী মেয়েটা। মিলির ইচ্ছে ছিলো বড় হয়ে খামার করবে,চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না ইকবাল স্যারের।
একমাত্র মেয়ের মৃত্যুতে আশরাফ কাকা কেমন জানো পাগলের মত হয়ে গেলেন। স্কুল থেকে মেয়েটা বাজারে আসত বাবার সাথে দেখা করে বাড়িতে যেত। স্বাভাবিক ভাবেই হত্যার কোনো স্বাক্ষী ছিলোনা। বিচার ও হবে না সবাই জানত। দুই মাস পর আশরাফ চাচা পুকুর ঘাটে পড়ে মারা যায়।
বাজারের পাশের জমিটা নিয়ে পাশের গ্রামের মেম্বার আউলিয়া খান আর মহিম শিকদারের মধ্যে ঝামেলা চলতেছে অনেক দিন ধরে। এই মাসেই দুইবার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়ে গেছে দুই দলের ভিতর। আউলিয়ার ৫ টা ছেলেকে সেদিন শিকদারের লোকেরা মেরে আধমরা করে ফেলছে।
এইটাই সুজোগ!!
মসজিদের থেকে ৫ মিনিটের হাটার পথ গ্রামের গোরস্থান। গোরস্থানের আশেপাশে আগে পুরা ফাঁকাই ছিল। ইদানিং দূরে দূরে কিছু ঘর বাড়ি উঠছে। পুরো গোরস্থান জুড়ে মাত্র তিনটি লাইট। সন্ধ্যার পর পরই লাইট গুলো জ্বলে উঠে। চারদিকে বড় বড় গাছে ভরা গোরস্থান দিনের বেলাতেই অন্ধকার মনে হয়। সন্ধ্যার পরে এই পথে মানুষের যাওয়া আসা একেবারেই কমে যায়। কিন্তু শরিফুল এই পথে যাতায়াত করতো। গোরস্থানের পিছনে থাকা ভাঙ্গা দালানে বসে সে আর তার সাগরেদরা নেশা করে। এই পথে আরও একজনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। শিহাবের। ছোটবেলা থেকেই তার কবর ভালো লাগে। অন্ধকারে কবরের উপর উঠে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। তার ভিতরের ভয়ংকর জন্তুটাকে সে এখানে এনে ঠান্ডা রাখে। বাইরের দুনিয়ায় মানুষের সাথে অভিনয় করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে যায়। সে ক্লান্তি দূর করতে সে এই কবরস্থানে আসে। এমনই একদিন সে লক্ষ্য করে শরিফুলকে। এবং সেদিনই শরিফুলের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়।
সেদিন রাতে শিহাব গোরস্তানে যায়,চুল বিক্রেতার কাছে থেকে কৌশলে আগেই এক গুচ্ছ চুল সে সরিয়ে রেখেছিলো। সেগুলো ভালো ভাবে গোরস্থানের বড় সিরিজ গাছটার পাশে একটু দূরত্ব রেখে রেখে ছড়িয়ে দিল। গাছের চারপাশে দুই সাইজের দুটি জুতার ছাপ দিলো মাটিতে। এই সময় তার পায়ে ছিল তার জুতার চেয়ে দুই সাইজ বড় মাপের জুতা। সাইজে বড় জুতা হওয়ায় জুতার পিছনে কাপড় দিয়ে টাইট করে নিয়েছে। হাঁটতে একটু অসুবিধা হলেও খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে না।
সোল টেকার। এক ফুট লম্বা,সামনের দিকে সুই এর মত সরু পিছনের দিকে ক্রমশ চওড়া, আর শেষের দিকে ক্রিকেটের ব্যাটের মত আরামদায়ক গ্রিপ। সঠিক অ্যাঙ্গেলে প্রেশার দিলে 6 ইঞ্চি মাংসও ভেদ হয়ে যাবে।
প্রায় তিন কেজি ওজনের ভারি রডটা হাতে নিলেই শিহাব মাতালের মত হয়ে যায়। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে এটা কোনো মানুসের মাথায় মারলে কি শুন্দর একটা আওয়াজ হত। ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায় তার,উইকেট দিয়ে একটা কুকুরের মাথার খুলি দুই ভাগ করে ফেলেছিলো। মাটিতে যখন কুকুরটা দাপাদাপি করছিলো, কি সুন্দর ছিলো সেই দৃশ্য। পুরনো স্মৃতি মনে করতে করতে তোর ঠোঁটের কোনা দিয়ে লালা বের হয়ে গেল। যেন কোনো প্রিয় খাবার খাওয়ার বাসনা জেগে উঠেছে মনে।
দুইঘন্টা অপেক্ষা করা তার কাছে ডালভাত,কিন্তু আজ মনটা অনেক ছটফট করছে। হাড় ভাঙ্গার শব্দটা শোনার জন্য আর সে ধৈর্য ধরতে পারছে না। এক সময় মনে হচ্ছিল আজ বোধহয় আর শিকার করা হবে না। তার ভিতরের পশুটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলো, দরকার হলে আজ শিকারকে বাড়িতে গিয়ে হত্যা করবে সে। অনেক কস্টে নিজেকে শান্ত করল সে। বেশি উত্তেজিত হলে সব পরিকল্পনা নস্ট হয়ে যাবে। অন্ধকারে অনেক কস্টে সে নিজের হাত কামড়ে মাংস খাবার থেকে নিজেকে বিরত রাখল।অন্ধকার তাকে মাতাল করে দেয়,অবাধ্য করে দেয় ভিতরের পশুটাকে।
হঠাৎ একটা শব্দ কানে আশায় সে সতর্ক হয়ে গেল। শিকার আসল অবশেষে! আনন্দে মনটা ভরে গেল। অনুভব করলে তার ঠোঁটের কোনায় লালা চলে এসেছে। তিন কেজি ওজনের রডটা হাতে নিয়ে নিল সে। তার পকেটে ছিলো গতমাসে কবর দেওয়া এক লাশের কাফনের কাপড়। কবর দেয়ার দিন রাতেই সে এই কবর খুড়ে লাশের কাফনের কাপড়টা নিয়ে নেয়। লাশের দুই কান কেটে নিয়ে এসেছিলো সে। বহুকস্টে সে লাসের মাংস খাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলো। অন্ধকার তার ভিতরে থাকা পশুটাকে অবাধ্য করে দেয়।
মাতাল শরিফুল ঢুলতে ঢুলতে এগিয়ে আশছিলো। সিরিজ গাছটার কাছে আসার সাথেই অন্ধকার থেকে বেইয়ে এলো সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরিফুলের হাটুর নিচে সমস্ত শক্তি দিয়ে পরপর দুইটা রডের বাড়ি মারল সে। চিতকার দিয়ে উঠল শরিফুল, মাথা নুইয়ে হাত দুটো পায়ের কাছে নিয়ে গেল। মাথাটা চোখের সামনে দেখে ইচ্ছে হচ্ছিল এখনি এক বাড়িতে খুলিটা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু তাহলে তো খেলা এখানেই শেষ। জলদি কাফনের ছেড়া কাপড়টা শরিফুলের মুখে ভরতে থাকল সে। এখন শুধু গো গো আওয়াজ বের হচ্ছে। দুই পায়ের হাড় ই ভেঙেছে। হাড়ভাঙ্গা শব্দগুলো এত মধুর কেন! যদি কোনদিন সুযোগ হয় হাড় ভাঙ্গার শব্দের উপর সে হয়তো একটা মহাকাব্য লিখতে পারবে। ভারী রডটি আবার উপরে উঠে গেল, সজোরে নেমে এলো শরিফুলের দুই হাতের কব্জির উপর। দুই হাতের কব্জিই দেওয়াল ঘড়ির ঘন্টার মত ঝুলতে থাকলো। তীব্র যন্ত্রণায় গোঙ্গানির আওয়াজ করা ছাড়া শরিফুলের আর কিছুই করার ছিল না। সে লক্ষ্য করল তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শিকার কে সিরিজ গাছটার পাশে এনে গাছের সাথে হেলান দিয়ে রাখল সে। দুই কাধ বরাবর রড দিয়ে 10 থেকে 12 টা করে আঘাত করলো সে। শিকার নিস্তেজ হয়ে এসেছে। ব্যাগে সযত্নে রাখা সোল টেকার বের করলো সে। একশ মিটার দৌড়ের প্রস্তুতি নেওয়ার মতো করে দুই পা পিছনে গেল সে। সজরে এগিয়ে গেল শিকারের দিকে, সোল টেকার ঢুকে গেল শিকারের বাম দিকের তৃতীয় পাজরে। তার ধারনার থেকেও ভালো কাজ করেছে অস্ত্রটা, পিঠ ভেদ করে গাছের সাথে গেথে গিয়েছে। শিকারের কান দুটো কেটে নিলো সে।
শিকারের মুখ থেকে কাফনের কাপড়টা বের করে নিল সে। ব্যাগ থেকে বের করল আগে থেকে কিনে রাখা কিং সাইজের চকলেট বোমা। তিনটা বোমাই তার মুখে পুরে দিল। সোল টেকার আর রড ব্যাগে ভরে নিল,তারপর ফিউজে আগুন লাগিয়ে দিল,বোমা গুলো ফাটতে 10 সেকেন্ড লাগবে,এর ভিতর এ তাকে সরে পড়তে হবে নিরাপদ দুরত্বে। এটা কোনো কঠিন বিসয় নয়,সে গোরস্থানের মধ্য দিয়ে ভাঙ্গা দালানের দিকে এগিয়ে যাবে। ১০ সেকেন্ড পরে তীব্র শব্দ পাওয়া গেল। ভাংগা দালানের দিকে যেতে যেতে সে ভাবলো, এরপরেও কি শরিফুল বেঁচে যেতে পারে! কত মিরাক্কেলই তো ঘটে! ঠোঁটের কোণ এ একটা হাসি দিয়ে সে ভাবতে থাকলো, বেঁচে গেলেও কি? তাকে আবার আক্রমণ করে মেরে ফেলবে সে। তার কোন শিকারই আজ পর্যন্ত বাঁচেনি।
পরদিন সকালে লাশ আবিষ্কার করা হলে দেখা গেল, মাথা থেকে গলা পর্যন্ত দুই ভাগ হয়ে দুইদিকে ঝুলছে, মুখ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই,মগজ গুলো চড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সব জায়গায়।